সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বর্ষা মৌসুমে মুমূর্ষু রোগীদের ভরসা শাকিলের স্পিডবোট, বিনামূল্যে জরুরি নৌযান সেবা মদনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনিয়ম ঢাকতে  ঔষুধ  পুড়ালেন পুস্টোরকিপার  মদনে পাচারের সময় ১০০ বস্তা সরকারি চাল জব্দ, আটক ২ দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভাষণ: ঢাকায় কেন উদ্বেগ? ৫ আগস্টের ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ও নেপথ্যের সমীকরণ! পরকীয়ার অভিযোগ গ্রামবাসীর হাতে আটক Content Creator রিপন মিয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার করলে ব্যবস্থা : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দিল্লিতে হাসিনার গণমাধ্যমে ভাষণ নিয়ে যা বলছে ভারত রাজধানীর তিন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল- ছাত্রশিবির দফায় দফায় সংঘর্ষ সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যয় ২০০০ কোটি টাকা মোহনগঞ্জে কর্মস্থলেই অসুস্থ- রক্তবমির পর প্রাণ গেল স্বাস্থ্য কর্মকর্তার

বর্ষা মৌসুমে মুমূর্ষু রোগীদের ভরসা শাকিলের স্পিডবোট, বিনামূল্যে জরুরি নৌযান সেবা

শাকিম আহমেদ স্টাফ রিপোর্ট...
  • আপডেট : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬ পঠিত

বর্ষা মৌসুমে চারদিকে থইথই পানি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নেত্রকোনার হাওর উপজেলা খালিয়াজুরীর মানুষের জেলা শহর কিংবা অন্যান্য উপজেলায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ইঞ্জিনচালিত নৌকা (ট্রলার)। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে এসব নৌযান না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন মুমূর্ষু রোগীরা।

জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে অনেক সময় বেশি টাকা দিয়ে ট্রলার রিজার্ভ করে খালিয়াজুরীর বোয়ালীঘাট, মদন উপজেলার উচিতপুর কিংবা দিরাই উপজেলার শ্যামারচর ঘাটে যেতে হয়। এতে অসচ্ছল ও নিম্নআয়ের পরিবারের রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বর্ষা মৌসুমে মুমূর্ষু রোগীদের বিনামূল্যে জরুরি নৌযান সেবা দিতে ব্যক্তিগত স্পিডবোট নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর গ্রামের আসিফ ইকবাল চৌধূরী শাকিল।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়: খালিয়াজুরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন কিংবা জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেওয়া প্রয়োজন—এমন রোগীদের জন্য শাকিল তাঁর ব্যক্তিগত স্পিডবোটটি বিনা ভাড়ায় ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছেন। বয়স্ক রোগী, গর্ভবতী ও প্রসূতি মা, শিশু এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উপজেলা সদরের বাইরে নেওয়ার ক্ষেত্রে এ সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বোয়ালীঘাট, মদন উপজেলার উচিতপুর কিংবা দিরাই উপজেলার শ্যামারচর ঘাট পর্যন্ত বিনামূল্যে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী এ স্পিডবোটের মাধ্যমে বিনামূল্যে জরুরি সেবা পেয়েছেন।

খালিয়াজুরী সদরের বাসিন্দা অরবিন্দু দেব বলেন, গত ১ আগস্ট রাতে তাঁর বৃদ্ধা মা স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। জরুরি চিকিৎসার জন্য দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে শাকিলের স্পিডবোটে বিনামূল্যে মাত্র ২০ মিনিটে বোয়ালী পৌঁছাতে সক্ষম হন। এতে সময় ও যাতায়াত খরচ দুটোই সাশ্রয় হয়েছে। দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারায় তাঁর মা এখন অনেকটাই সুস্থ।

নগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অমর চৌধূরী বলেন: বিনা পয়সায় স্পিডবোট সার্ভিসটি গরিব ও অসহায় রোগীদের জন্য খুবই উপকারী ।
খালিয়াজুরীতে প্রয়োজনের সময় ভালো যানবাহন পাওয়া কঠিন। শাকিলের উদ্যোগে রোগীদের দ্রুত বোয়ালী, উচিতপুর এমনকি শ্যামারচর পর্যন্ত বিনা ভাড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগীরা যেমন উপকৃত হচ্ছেন, তেমনি শাকিল চৌধূরীও প্রশংসার দাবিদার।

কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মুসা মিয়া বলেন, “শাকিল ভাইয়ের বিনা খরচে স্পিডবোট সেবা না পেলে আমার ছোট ভাইকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। স্ট্রোক করার পর চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত ময়মনসিংহে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। স্পিডবোটে শাল্লা থেকে উচিতপুর দ্রুত পৌঁছাতে পারায় আল্লাহর রহমতে ভাইকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছি। কৃষিতে ক্ষতি হওয়ায় এত টাকা খরচ করে যাতায়াত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

স্পিডবোট চালক মো. উছমান মিয়া জানান, তিনি নিজেই স্পিডবোটটি পরিচালনা করেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিনা ভাড়ায় এ সেবা দেওয়া হয়। রাতে আবহাওয়া ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সার্ভিস বন্ধ থাকে। তিনি বলেন, “উন্নত চিকিৎসার পর রোগী সুস্থ হয়ে স্বজনরা যখন কৃতজ্ঞতা জানান, তখন খুব ভালো লাগে। এ সেবা পেয়ে অনেক অসহায় ও দরিদ্র রোগী সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।

এদিকে ২০১৭ সালে আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দুর্দশা দেখতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খালিয়াজুরী সফরে এসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করেছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেটি ব্যবহার না হওয়ায় বর্তমানে অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খালিয়াজুরী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আরিফিন আজিম বলেন, “হাওরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খালিয়াজুরী হাসপাতালে একটি উন্নতমানের নৌ-অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করেছিলেন। কিন্তু দক্ষ চালক ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধার অভাবে সেটি বর্তমানে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। নতুন করে আরও একটি নৌ- অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।

শাকিলের স্পিডবোট সার্ভিস সম্পর্কে তিনি বলেন: হাসপাতালের আরএমও এ বিষয়ে অবগত আছেন। কোনো মুমূর্ষু রোগীর জরুরি প্রয়োজনে আরএমও শাকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিনামূল্যে স্পিডবোট সেবা দিয়ে থাকেন। এ পর্যন্ত কতজন রোগী এ সেবা পেয়েছেন, সেই সংখ্যা আমার জানা নেই। তবে দুর্গম হাওরাঞ্চলে এ সেবার কারণে রোগীরা উপকৃত হচ্ছেন।

খালিয়াজুরীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অলিদুজ্জামান বলেন, বিনা ভাড়ায় শাকিল চৌধূরীর স্পিডবোট সার্ভিস দেওয়ার বিষয়টি তিনি লোকমুখে শুনেছেন। জনস্বার্থে তাঁর এ ব্যক্তিগত উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কতজন রোগী এ সেবা পেয়েছেন, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও শাকিল চৌধূরী ভালো বলতে পারবেন।সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, তিনি এখানে যোগদানের পর শুনেছেন হাসপাতালে একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, তবে সেটি অকেজো। মুমূর্ষু রোগীদের জন্য নতুন করে একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে সেটির অগ্রগতি কতদূর, তা তিনি জানেন না।

সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স থাকা সত্ত্বেও সেটি সচল না থাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে শাকিলের স্পিডবোটই বর্তমানে অনেক রোগীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভরসা হয়ে উঠেছে। তবে স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করা, দক্ষ চালক নিয়োগ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

আসিফ ইকবাল চৌধূরী শাকিল বলেন, খালিয়াজুরী হাওর এলাকা। বর্ষাকালে এখানকার মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌযান। মুমূর্ষু রোগীদের সময়মতো উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে নিতে না পারলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। তাই আমার ব্যক্তিগত স্পিডবোটটি অসুস্থ রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছি। একজন অসুস্থ মানুষকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারাটাই আমার কাছে তৃপ্তির। তিনি আরও বলেন: যতদিন প্রয়োজন হবে, মানবিক দিক বিবেচনা করে এই সেবা চালু রাখার চেষ্টা করব।

স্থানীয়দের দাবি, হাওরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বর্ষাকালে ২৪ ঘণ্টা জরুরি নৌযান ব্যবস্থা চালু করা গেলে মুমূর্ষু রোগীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে স্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো সংবাদ
শিরোনাম...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক ক্লিকে বিভাগের খবর
© All rights reserved © 2023-2025 Daily Netrakona News